নতুন ভোরে’র স্বপ্ন দেখাচ্ছে কোভি’শিল্ড, নেপথ্য নায়ক এক বাঙালি বিজ্ঞানী, গর্বের হাসি হাসছে যাদবপুর

কখনও হোক কলরবের মতো সাড়া জাগানো আন্দোলন, কখনও আবার বিদ্যায়তনিক চর্চায় কোনও নতুন শৃঙ্গজয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যলয় সবসময়েই স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জল। কিন্তু উৎকর্ষের প্রশ্নে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক যত নজির তাকে সম্ভবত ছাপিয়ে যাবে এক প্রাক্তনীর কীর্তি। তিনি ডক্টর স্বপন জানা, ১৯৮৫-১৯৯১ ব্যাচের বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র। সেরাম ইন্সটিটিউটের করোনা টিকা উৎপাদন প্রকল্পের অন্যতম কাণ্ডারী। গোটা ভারত চাতকের মতো চেয়ে আছে যে বিষল্যকরণীর দিকে তা তাঁরই ঘাম-রক্তের ফসল। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রাঙ্গনে একসময় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন সেদিনের সেই দামাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া, শেষ বিকেলের রোদ বলে যায়, সেই ইঁট-কাঠও যেন হাসছে গর্বের হাসি।

কাছ থেকে স্বপন জানাকে দেখেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড অ্যান্ড টেকনোলজি অ্যান্ড বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক দীপঙ্কর হালদার। আজ তাঁদের গর্বের দিন। ফোনালাপের শুরুতেই বলছিলেন পরিচয় পর্বের কথা। দীপঙ্করবাবুর কথায়, ডক্টর জানা যে আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত তা বলতে পারি না। এখানে চাকরি করতে এসে ওঁকে পাই। আমাদের অন্যতম সেরা প্রাক্তনী বলে সকলের মুখে মুখেই ওঁর নাম ফিরত। আমি চাকরিজীবনে অধ্যাপক ললিতাগৌরী রায়ের সস্নেহ প্রশ্রয় পাই। ললিতাদির সঙ্গে দারুণ ঘনিষ্ঠতা ছিল ডক্টর জানার। ওঁর কাছেই ওর পিএইচডি।”

ক্রমে যোগাযোগ বাড়তেই স্বপন জানার ব্যপ্তিটা বুঝতে পারেন অধ্যাপক হালদার। বাড়ে ঘনিষ্ঠতাও। তাঁর কথায়, “কলকাতায় আসলেই উনি যোগাযোগ করতেন। জানতাম ওঁরা কীভাবে কাজ করেন। উনি যে পরিমাণ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন তা দূর থেকেই বুঝতে পারতাম।”

ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করা সব বিশেষজ্ঞই আজ এক বাক্যে মেনে নিচ্ছেন, ২০২০ সালটা ছিল ডক্টর জানার। শুধু করোনা টিকাই নয়, অন্যত্রও তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ২৮ ডিসেম্বর সেরাম ইন্সটিটিউট নিউমোকোকাল কনজুগেট ভ্যাকসিন উদ্বোধন করে ‘নিউমোকক্কাল পলিস্যাকারাইড কনজুগেট ভ্যাকসিন’ (পিপিএসভি২৩) নামক এই ভ্যাকসিন নিওমোনিয়ার পাশাপাশি ফুসফুসের ২৩ রকমের নিউমোকোকাল সংক্রমণ আটকাতে সক্ষম। ২০১৩ সালের ট্রায়াল থেকে ২০২০ সালের লঞ্চ পর্যন্ত এই প্রজেক্টটির নেতৃত্ব দেন স্বপন জানা। সস্তার এই টিকা সাড়া ফেলে দিয়েছিল চিকিৎসা জগতে। স্বয়ং বিল গেটস এই কাজের প্রশংশা করে বলেছিলেন, ভারত করোনা ভ্যাকসিন প্রস্তুত করতে পারে অনায়াসে।

সেই আপ্তবাক্যকে সত্যে পরিণত করেছেন ডক্টর জানা ও তাঁর সহকর্মীরা। একদিকে এতবড় যুদ্ধ, অন্যদিকে সাফল্যের এই সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক, এসবের মধ্যে স্বপন জানা তাঁর শিকড় ভোলেননি। বড় গাছ যেমন ছোট গাছকে স্নেহচ্ছায়া দেন, স্বপন জানা তেমনই। অধ্যাপক দীপঙ্কর হালদার বলেন,”এই করোনা পরিস্থিতিতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজের জন্য আমাদের বিভাগের তিনজন সদ্য পাশ করা ছাত্রকে ডেকে নেন উনি। তাঁরাও লাগাতার রাতদিন জেগে পরিশ্রম করে দিয়েছে। প্রতিনয়ত আপডেট দিয়েছে বিভাগে। ওঁরাও আমাদের অহঙ্কার।” তাঁর গলাটা যেন ইষৎ কাঁপল আবেগের ধাক্কায়।

প্রথম ব্যাচ ছাড়া হয়েছে কোভিশিল্ডের। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে এক পা এগনো গিয়েছে, এখন কয়েক কোটি মানুষ তাকিয়ে আছে তাঁদের দিকে, বিলক্ষণ জানেন স্বপন জানার নেতৃত্বে কাজ করতে যাওয়া ওই ত্রয়ী, সৌমদীপ, গৌতম, কিংশুক (সংস্থার শর্তাবলীর কারণেই তাদের পুরো পরিচয় দেওয়া গেল না)। পাশাপাশি, তাঁরা এও জানে, বিশ্ববিদ্যালয়র ইতিহাসে আজকের দিনটা যে সোনার জলে । আর সেইসঙ্গে এও জানেন, সেই ফলকে জ্বলজ্বল করবে তাদের নাম। ডক্টর জানা অবশ্য তাঁদের নিজের কাজ দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন, থামা চলবে না, এখনও সামনে পথ হাঁটা বাকি…।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে এদিন ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া হয় ডক্টর জানার কৃতিত্বের কথা উল্লেখ করে। বিশ্ববিদ্য়ালয় কতৃপক্ষ লেখে, “অ্যাস্ট্রোজেনেকার সঙ্গে জোট বেঁধে ভ্যাকসিন তৈরি করল সেরাম ইন্সটিটিউট। সেই টিকা এখন সরবরাহও শুরু হয়েছে। সেরাম ইন্সটিটিউটে আমাদের অনেকানেক শুভেচ্ছা। আমরা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী স্বপন জানার কথা। ভ্যাকসিনটি উৎপাদনের সঙ্গে গোড়া থেকে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় আশা রাখে এমন একজন করোনাযোদ্ধার চলার পথ তাদের পাথেয় হবে।”

গোটা দেশ আরোগ্যের পথে হাঁটবে খুব শিগগির। নিজের পরীক্ষাগারে আরেকটি যুদ্ধের সঙ্গে লড়াইয়ের অস্ত্রে শান দিয়ে যাবেন স্বপনবাবু। কোন বিশেষণে কুর্নিশ জানানো যায় তাঁকে, অভিধানও নীরব…


অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো