Jana Ojana Tottho

AK 47 Gun আবিস্কারের ইতিহাস এবং অন্যান্য

অস্র নিয়ে যার বিন্দুমাত্র ধারনাও নেই সেও শুনেছে AK 47 অস্রের কথা কিন্তু এর ইতিহাস জানে কয়জন? আমরা অনেকেই জানিনা, তাই আজকে ব্লগের পাঠকদের জন্য আজকের ব্লগ আমি সাজিয়েছি AK 47 Gun আবিস্কারের ইতিহাস এবং কার্যপ্রণালী নিয়ে। আসুন তাহলে জেনে নেই AK 47 নিয়ে যতকথা।

প্রথমেই বলে রাখি AK 47 Gun হল বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্বক অস্র এবং ২০০৪ সালে প্লে ব্লয় ম্যাগাজিন একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল যেখানে বিশ্বকে বদলে দেয়া ৫০টি পণ্যের তালিকা ছিল আর AK 47 সেই তালিকায় স্থান করে নিয়েছিল।

কে আবিস্কার করেছে এই বিধ্বংসী মরনাস্র

মিখাইল কালাশনিকভ AK 47 Gun এর আবিস্কারক। প্রথমেই তার সম্পর্কে জেনে নেই। মিখাইল কালাশনিকভ জন্মগ্রহন করেন ১৯১৯ সালের ১০ নভেম্বর। তার জন্মস্থান পশ্চিম সাইবেরিয়াতে। সাধারন এক কৃষক পরিবারে তার জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই ছিল উদ্ভাবনী প্রতিভা। কিশোর বয়সেই তিনি তার প্রমান রাখেন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে। ১৯৩৮ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন একজন ট্যাংক ড্রাইভার হিসেবে।

ট্যাংক থেকে গোলা নিক্ষেপের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সেনাবাহিনীতে তরুন উদ্ভাবকের পরিচিতি পেয়ে যান খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার ১৯৪১ সালে যুদ্ধে তিনি আহত হন।

মিখাইল কালাশনিকভ ছোটবেলা থেকেই চেয়েছিলেন কবি হতে, কিশোর বয়স থেকেই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করে দেন। রাইফেল নিয়ে কাজ করলেও তিনি আজীবন কবিতা লিখে গেছেন।

কিভাবে AK 47 Gun আবিস্কার করেন মিখাইল কালাশনিকভ

জার্মান বাহিনীর হাতে গুলি খেয়ে আহত মিখাইল কালাশনিকভ সবসময়ই চিন্তা করতেন কিভাবে জার্মানদের চেয়ে আধুনিক অস্র বানানো যায়। যুদ্ধে আহত মিখাইল কালাশনিকভ যখন বিছানায় শুয়ে ছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে তার মাথায় খেলে যায় এক রাইফেলের নকশা যা হবে একই সাথে সব পরিস্থিতিতে টেকসই, আগ্নেয়াস্র হিসেবে হবে মারাত্বক বিধ্বংসী, নকশাও খুবই সাধারন আর তৈরি করার খরচও খুব কম। আর এটির রক্ষণাবেক্ষণও খুব সহজ।

প্রায় সাত বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি তৈরি করেন  মিখাইল কালাশনিকভ । মিখাইল কালাশনিকভের নকশা করা অস্র এখনও রাজত্ব করে যাচ্ছে। নামকরণও করা হয় তার নামেই।

Avtomat Kalashnikova- এভটোমাট  কালাশনিকভ থেকে সংক্ষেপে AK এবং এর ডিজাইন সম্পন্ন হবার বছর ১৯৪৭ সালের ৪৭ নিয়ে এর সম্পূর্ণ নাম AK 47। এভটোমাট  শব্দটি রুশ শব্দ যার অর্থ অটোমেটিক।

মাত্র আটটি অংশে বিভক্ত এই AK 47 অস্রটি আর মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মাঝেই এই আটটি অংশ খুলে জোড়া দেয়া সম্ভব। আর এই অস্র পানিতে নিমজ্জিত অবস্থাতেও সম্পূর্ণরুপে কাজ করতে সক্ষম।

স্বীকৃতিস্বরুপ লন্ডনের ডিজাইন মিউজিয়াম মিখাইল কালাশনিকভের AK 47 কে  ২০১১ সালে নির্বাচিত করে, সাথে আরও অন্যান্য ডিজাইনও ছিল।

বিশ্বে ১০ কোটিরও বেশি AK 47 Gun ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা দেশে। কিন্তু মিখাইল কালাশনিকভ এখান থেকে এক পয়সাও পাননি। কারণ সোভিয়েত সরকার এর পেটেন্ট করেনি। বলা হয়ে থাকে এতে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে তার এবং সরকারের। আর তাছাড়া ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোতে কোন পেটেন্ট এর সিস্টেম ছিলনা। মিখাইল কালাশনিকভ ছিলেন তার দেশের একজন কর্মচারি মাত্র।

২০০৯ সালে রাশিয়ান সরকার তার হাতে “হিরো অব রাশা” পদক তুলে দেন।

AK 47 Gun এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

AK 47 Gun

AK 47 Gun হল একটি গ্যাস অপারেটেড স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্র। বিশ্বের ১০৬ টিরও বেশি দেশের সামরিক বাহিনীতে এটি ব্যবহিত হচ্ছে।

  • প্রস্তুতকারক দেশঃ সোভিয়েত ইউনিয়ন
  • আবিস্কারকঃ মিখাইল কালাশনিকভ
  • ডিজাইনের বছরঃ ১৯৪১-১৯৬৭ (সম্পন্ন হয় ১৯৪৭ সালে)
  • কার্টিসঃ ৭.৬২*৩৯ মিমি
  • রেট অভ ফায়ারঃ ৬০০ রাউন্ড পার মিনিট
  • রেঞ্জ/ কার্যকর দুরত্বঃ ৩০০ মিটার
  • ওজনঃ ৪.৩ কেজি
  • দৈর্ঘ্যঃ ৮৭০ মিমি
  • ম্যাগাজিনঃ ৩০ বা ৪৫ রাউন্ড বক্স ম্যাগাজিন অথবা ৭৫ বা ১০০ রাউন্ডের ড্রাম ম্যাগাজিন।

কিভাবে চালাবেন AK 47 Gun

AK 47 Gun চালানোর মত সহজ কাজ বোধ হয় দুনিয়াতে আর নাই। যে কেও সামান্য ট্রেনিং পেলেই এই কাজ করতে পারবে। এমনকি আপনিও পারবেন। এটা চালানো শেখা নাকি মাত্র এক ঘন্টার ব্যাপার। এই এক ঘন্টায় একটি শিশুও শিখে নিতে পারবে AK 47 Gun দিয়ে ফায়ার করা।

এটিকে চালানোর দুইটি উপায় আছে। একটি সেমি অটমেটিক আরেকটি ফুল অটোমেটিক মোড।

প্রথমে ম্যাগাজিন লোড করে নিয়ে সিলেক্টরকে লেভেল অফে নিয়ে আবার ছেড়ে দিতে হবে। এবার ট্রিগার টেনে রাখলে যতক্ষন ট্রিগার না ছাড়বেন ফায়ারিং চলতেই থাকবে যদি ম্যাগাজিন শেষ না হয়। ম্যাগাজিন শেষ হয়ে গেলে আবার আগের প্রসেস করে নিতে হবে।

ফুল অটোমেটিক মোডে ফায়ার করতে ম্যাগাজিন লোড করার পর সিলেক্টরটাকে লেভেল অফে নিয়ে সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিয়ে মাঝামাঝি রাখতে হবে।ট্রিগার টানলেই ফায়ার শুরু হবে। দ্বিতীয়বার ফায়ার করার জন্য আর ট্রিগার টানার কোন প্রয়োজন নাই।

কতটা ভয়ংকর AK 47 Gun

AK 47 Gun এর সবচেয়ে বড় শক্তি হল এর বুলেটের ভেদন ক্ষমতা। এর বুলেট ৭১৫মিটার/সেকেন্ড স্পিডে ৮ ইঞ্চি পুরু ওক কাঠকে ভেদ করতে পারে, এমনকি ৫ ইঞ্চি কনক্রিট দেয়াল ভেদ করার ক্ষমতাও রাখে এই বুলেট। এছাড়া সিঙ্গেল শট, ব্রাস্ট এবং গ্রেনেড ছোড়ার সুবিধা রয়েছে।

বলা হয়ে থাকে কামান, বিমান হামলা কিংবা রকেট হামলার তুলনায় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে AK 47 Gun এর বুলেটে। এমনকি প্রতি বছর আড়াই লাখ মানুষের প্রাণ যায় AK 47 Gun এর বুলেটে।

বর্তমানে রাশিয়া ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশ AK 47 তৈরি করে থাকে। চীন, ইসরায়েল, ভারত, মিশর, নাইজেরিয়া সহ বিশ্বের ৩০ টি দেশের লাইসেন্স রয়েছে AK 47 রাইফেল তৈরি করার।

AK 47 Gun কেন এত জনপ্রিয়তা পায়

AK 47 এর জনপ্রিয়তার মূল কারণ নিয়ে বলতে গেলে আমাদের বলতে হবে

  • এটি হালকা এবং সহজে বহনযোগ্যন।
  • এটি চালানো খুব সহজ এবং এর রক্ষনাবেক্ষন খুব সহজ।
  • এটি যেকোন পরিবেশে ভাল ফল দেয় এমনকি পানির নিচে কিংবা আগুনের মধ্যে।
  • এটি সেমি অটোমেটিক এবং অটোমেটিক মোডে চালানো যায়।
  • এর বুলেটের ভেদন ক্ষমতা অনেক বেশি। ৮ ইঞ্চি কাঠ বা ৫ ইঞ্চি কনক্রিটের দেয়াল ভেদ করতে পারে।
  • এটি মিনিটে ৬০০ রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে।
  • সর্বপরি এটি অস্র হিসেবে মারাত্মক বিধ্বংসী।

মিখাইল কালাশনিকভের উক্তিসমূহ

তিনি ২০০৭ সালে বলেছিলেন, ‘আমি তো ভালোভাবেই ঘুমিয়েছি। এটি রাজনীতিবিদদের ব্যাপার, যাঁরা সহিংসতা দমন করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তাঁরাই দোষী।’ এ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে দেখে দুঃখ পেয়েছিলেন মিখাইল কালাশনিকভ। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার তৈরি অস্ত্র দিয়ে যখন সন্ত্রাসীদের গুলি চালাতে দেখি, তখন কষ্ট পাই।’

এছাড়াও তিনি বলেন, “যখন বিন লাদেনের হাতে একে-৪৭ দেখি তখন আমি চিন্তিত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমার কি দোষ; সন্ত্রাসীরা তো আর বোকা নয়; তারাও সবচেয়ে ভাল অস্ত্র ব্যবহার করে।”

আরও বলেন, “আমার উদ্ভাবন এখন অনেক দেশের স্বাধীনতা আনে।” জার্মানদের নিয়ে তিনি বলেন, “জার্মানদের জন্যই আমার একে৪৭ ডিজাইন করতে হয়েছিল। তা না হলে আমি কৃষি কাজে প্রয়োজনীয় এমন যন্ত্র বানাতাম।”

মিখাইল কালাশনিকভের যত উদ্ভাবন

মিখাইল কালাশনিকভ তার জীবনে ১৫০টি ছোট অস্র মডেল ডিজাইন করেছেন যার মধ্যে অন্যতম হলঃ

AK-47, AKM, AK-74/AKS-74U/AK-74M, AK-101/AK-102, AK-103/AK-104, AK-105, AK-12, RPK/RPK-74, PK, PKM, PKP, Saiga ইত্যাদি।

মিখাইল কালাশনিকভের মৃত্যু

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মিখাইল কালাশনিকভকে ১৭ নভেম্বর ২০১৩ তাকে হাসপাতালে নেয়া হয় এবং ২৩ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে ৯৪ বছর বয়সে এই আবিস্কারকের মৃত্যু ঘটে।

জানুয়ারি ২০১৪ সালে একটি চিঠি প্রকাশ করা হয় যা কিনা লিখেছিলেন মিখাইল কালাশনিকভ তার মৃত্যুর ৬ মাস আগে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি ভুগছিলেন কোন এক আধ্যাত্মিক রোগে যার কারণ তার আবিষ্কৃত AK 47 Gun রাইফেলের বুলেটে মারা যাওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের অভিসাপ।

এরকম নিত্য নতুন তথ্য জানতে HelpBangla.com নিয়মিত ভিজিট করুন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button