শুক্রবার, ৮ মে, ২০২০

অতৃপ্ত আত্মা

লেখক: সাইফুল ইসলাম

স্যার বাসায় যাইবেন না?
অফিস সহকারী কদম মিয়ার ডাকে আমার কাজে বিঘ্ন ঘটে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত ১ টা বেজে গেছে! বস একটা জরুরী কাজে চিটাগাং গেছেন। আগামীকাল বাইরের বায়ারদের সাথে মিটিং আছে। যেহেতু বস নেই আর তাই কালক মিটিং আমাকেই করতে হবে। মিটিং এর জন্য ফাইল ও প্রেজেন্টেশন রেডি করতে করতে কখন যে ১ টা বেজে গেল টেরই পেলাম না।

-- কদম মিয়া ডেস্কটা গুছিয়ে রেখো‌ আমি এখনই বের হচ্ছি।
-- স্যার বাইরে অনেক ঝড় বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া কিছু নাই।
কেমনে রাখবেন? স্যার আইজকে রাতটা অফিসেই থাইকা যান।
-- না কদম মিয়া বাসায় যেতে হবে আগামীকাল মিটিং আছে। আশা করি একটা কিছু পেয়ে যাবো।

বাইরে বের হয়ে ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করার পর কোন বাস বা রিকশা পেলাম না। আমার অফিস কাকরাইল মোড়ে আর বাসা পরীবাগে। যেহেতু বাসা খুব দূরে না তাই ভাবলাম হেঁটেই চলে যাওয়া যাক।
বাইরে শুনসান নিরবতা। হাঁটতে হাঁটতে কাকরাইল মসজিদ পার হয়ে রমনা পার্কের পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। রমনা পার্কের এই পাশের রাস্তা দিনের বেলায় এমনিতেই নিরব থাকে আর এই রাত ১ টায় মনে হচ্ছে কোন গভীর অরণ্যের একটি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি! আর ঝড়-বৃষ্টি হওয়ায় চারদিকে আরো বেশী নিস্তব্ধ, নিরবতা। মাঝেমধ্যেই গাছে পেঁচার ডাক শুনা যাচ্ছে। ঢাকা শহরে যে এখনো পেঁচা আছে তা এতো রাত না হলে জানতেই পারতাম না। আমি এগিয়ে যাচ্ছি পেঁচার ডাক, পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ বড় বড় গাছের আলো ছায়া কেমন যেন একটু ভয় ভয় লাগছে আমার। মাঝে মাঝে গাঁ শিউরে উঠছে। এমনিতে আমি জ্বীন ভূতে বিশ্বাস করি না। আমি হেঁটেই যাচ্ছি আজকে মনে হচ্ছে এই রাস্তা টা বুঝি অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে! এখনো শেষ হচ্ছে না কেন? অনেক টুকু হেঁটে আসার পর হঠাৎ করেই সামনে মাঝ রাস্তায় দেখি কিছু একটা পড়ে আছে।
এমনিতে ফুটপাতে অনেকেই ঘুমিয়ে থাকে কিন্তু মাঝরাস্তায় কেউ নিশ্চয়ই ঘুমাবেন না।

আরেকটু এগিয়ে আসতেই দেখি একজন মানুষ। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, ভয়ে ভয়ে কাছে গেলাম। একজন অপরিচিতা মহিলা রাস্তায় পড়ে আছে! মাথার এক পাশ দিয়ে রক্ত বের হয়ে গেছে।
নিশ্চয়ই কোন গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়েছে! আমি আস্তে আস্তে নাকের কাছে হাত নিলাম এখনও নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমি ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করে অপরিচিতার চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দিলাম।
মহিলা সাথে সাথে চোখ খুলে উঠে বসলো।

-- কি হয়েছিল আপনার?
-- আমি একটা সিএনজির সাথে ধাক্কা খাই। তারপর আর মনে নেই।
-- বাসা কোথায়? আর এখানে এলেন কি করে?
বাসা কোথায় জিজ্ঞেস করতেই বলতেই মহিলা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। আমার বাসা রাজাবাজারে। এখানে এলেন কি ভাবে।
-- আমাকে বাসায় যেতে হবে বাসায় আমার ছেলে একা।
মহিলা হাঁটতে গিয়ে আবার পড়ে যাচ্ছিল আমি ধরলাম।
-- আপনি অসুস্থ আগে হাসপাতালে যেতে হবে। তারপর বাসায়।
-- না না আমি আগে বাসায় যাবো রাফসান বাসায় একা আছে। বাচ্চা ছেলে নিশ্চয়ই অনেক খিদে পেয়েছে হয়তো ভয়ও পাচ্ছে। আমি বাসায় যাবো।
-- কিন্তু আপনি তো একা যেতে পারবেন না। আসুন আমি আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।

অনেক টুকু হেঁটে আসার পর শেরাটনের সামনে একটা রিকশা পাই।
রাজাবাজারের একটি বাসার সামনে গিয়ে মহিলা রিকশা দাড় করাতে বলে। ৫ তলা বাসায় কোন দারোয়ান নেই।
-- কয় তলায় আপনার বাসা।
-- নীচ তলাতেই।
-- আসুন আপনাকে ফ্লাটে পৌঁছে দিয়ে আসি।
-- ধন্যবাদ আসুন।

বাসায় ঢুকে দেখি সোফাগুলো সব সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা।
মনে মনে ভাবছি উনি তো বাসায়ই থাকেন তবে শোফাগুলো ঢাকা কেন?
-- ময়লা হয়ে যায় তাই ঢেকে রেখেছি!
আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি তো উনাকে জিজ্ঞেস করিনি! উনি শুনতে পেলো কেমন করে?
-- আপনার ছেলে কোথায়?
-- আপনি বসুন আমি একটু চা করে আনছি। চা খেতে খেতে বলছি। যদি আপনার বাসায় যাওয়ার তাড়া না থাকে। সকালে তো আপনার মিটিং আছে!
-- আপনি জানলেন কিভাবে?
এবার আমি মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম।
-- আপনি আসার সময় বলছিলেন আমাকে পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরে ঘুমাবেন সকালে মিটিং আছে।
এবার আমি আরো বেশি অবাক হলাম কারণ এসব তো আমি মনে মনে বলেছিলাম। যাইহোক আমি আর কিছু বললাম না। হয়তোবা আমার ভুল হচ্ছে আমি হয়তো শুনিয়েই বলেছি।

-- আপনি বসুন আমি চা নিয়ে আসছি।
মহিলা কয়েকমিনিটের মধ্যে চা নিয়ে হাজির একই সাথে পড়নের শাড়ীটা বদলে সাদা শাড়ি পরে এসেছে। মহিলা এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে শাড়ি চেঞ্জ করে চা বানিয়ে নিয়ে আসলেন তাই মনে মনে ভাবছি। এবারও মহিলা আমার মনে মনে বলা কথার উত্তর দিয়ে দিলো।

-- আমি খুব দ্রুত কাজ করতে পারি। গত এক সপ্তাহ ধরে আমার কাজ করার ক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে।
-- ও আচ্ছা। আপনার হাজব্যান্ড ও ছেলে কোথায়।
মহিলা ছেলেকে নাম ধরে ডাকতেই সাদা পাঞ্জাবি পড়া আট বছরের একটা ছেলে আসলো।
-- আঙ্কেলকে সালাম দাও।
ছোট ছেলেটি আমাকে গম্ভীর হয়ে সালাম দিল।
-- কেমন আছো‌ বাবু?
ছেলেটি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। মুখে কোন হাঁসি নেই। অথচ এই বয়সের বাচ্চারা অনেক বেশি হাসিখুশি ও চঞ্চল প্রকৃতির হয়ে থাকে।
-- আপনি ঐখানে গেলেন কেমন করে?
-- আমার ‌স্বামী একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। অফিসের কাজে গত সপ্তাহে চিটাগাং গেছে। বাড়িতে আমি আর আমার ছেলে।
আমাদের বাসায় কোন সিকিউরিটি নেই।
হঠাৎ রাত ১১ টার দিকে কলিং বেল বেজে উঠলো। আমি তখন বাথরুমে রাফসান ভাবলো ওর বাবা এসেছে। ছোট্ট ছেলে কিছু না ভেবেই দরজা খুলে দিল। কিন্তু দরজা খুলে দেখে ওর বাবা আসেনি। এসেছে দুজন লোক। হঠাৎ রাফসান চিৎকার করে উঠল আমি বাথরুম থেকে বেড়িয়ে দেখি রাফসান মেঝেতে পড়ে আছে। এরমধ্যে একজন আমাকে আটকে ফেলে। ঘরের টাকা পয়সা গহনা সব কিছু নিয়ে নেয়। একটা পর্যায়ে আমার দিকে লোলুপ দৃষ্টি পরে। আমি বিষয়টি বুঝতে পেরে নিজেকে ছাড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা করি। একটা পর্যায়ে নিজেকে ছাড়াতে পারি। দরজা খোলা ছিল তাই আমি অন্য কোন কিছু না ভেবেই দরজা দিয়ে বের হয়ে দৌড় দেই। এদিকে আমার ছেলেটা মেঝেতে পড়ে আছে তাই আমি সোজা রাস্তায় বের হয়ে যাই যাতে ওদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে পারি এবং ডাক্তার নিয়ে আসতে পারি।
কিছুক্ষণ আগেই ঝড় বৃষ্টি হয়েছে তাই দোকান পাট বন্ধ ছিল ও রাস্তাঘাটে কোন মানুষজন ছিলো না। আমি ওদের সাথে পারলাম না। ওরা আমাকে ধরে ফেলল। তারপর গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায় রমনা পার্কের ঐদিকে। গাড়ী থেকে নামানোর সময় আমি আবার ওদের হাত থেকে পালিয়ে দৌড় দেই। তারপর একটা গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাই।
এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।
-- ওদেরকে আপনি চিনতে পেরেছেন?
-- না আমি চিনতে পারিনি তবে আমার ছেলে ওদের একজনের ছবি আঁকতে চেষ্টা করছে। আজকেই আঁকা শেষ হয়ে যাবে।
তারপর যা‌ করার পুলিশ করবে।

-- আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে। সাবধানে থাকবেন আমি যাচ্ছি তাহলে।

আমি বাসায় চলে আসলাম।
খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে‌ ফ্রেশ হয়ে অফিসে গেলাম। অফিসের টিভি চলছে, হঠাৎ করেই চোখ চলে যায় একটা নিউজের দিকে।

অবশেষে পুলিশ গত সপ্তাহে রমনা পার্কের পাশের রাস্তায় একজন মহিলার মৃতদেহ পাওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছে।
জানা যায় মহিলার বাসা রাজাবাজারে। বাসায় মহিলার ৮ বছরের ছোট ছেলেকেও মৃত পাওয়া গিয়েছিল। তখন পুলিশ কোন সূত্র খুঁজে পাচ্ছিলো না। তাই দ্বিতীয়বার বাসায় তল্লাশি চালানো হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এবার বাসায় হাতে আঁকা একটি ছবি পাওয়া গেছে এবং ছবির লোকটিই হত্যাকারী। ওরা দুইজন মিলে প্রথমে বাড়িতে লুটপাট করে এরপর বাচ্চাটিকে হত্যা করে মহিলা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে মারা যায়। অপরাধীরা তাদের দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু কে সেই ছবি এঁকেছে এটি এখনো একটি রহস্য।

নিউজ দেখার পর আমি ধরধর করে ঘামতে লাগলাম। এই মহিলা আর বাচ্চা যদি একসপ্তাহ আগে খুনি হয়ে থাকে তাহলে গতরাতে আমার সাথে যা ঘটলো সেটা কি ছিল?
আমি এই ঘটনার কোন ব্যাখ্যা করতে পারলাম না। হয়তোবা ওদের অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাইহোক অবশেষে অপরাধী ধরা পড়েছে। এবার নিশ্চয়ই ওদের অতৃপ্ত আত্মা শান্তি পাবে।

বিঃদ্রঃ বাসায় যারা একা থাকেন তারা সবসময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করবেন। কখন কোন বিপদ দরজায় কড়া নাড়বে তা কেউ জানেনা।
(সকল ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক)

Share This Post Now


Related Posts

অতৃপ্ত আত্মা
4/ 5
Oleh