11.19.2019

গ্যাস্ট্রিকের ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

আজ অনেক দিন পর আবার হাজির হলাম সময় হয়ে উঠে না। তাই লেখাহয় না । লেখার ঝামেলা হলো, । মেডিকেল সাইন্সের জটিল ভাষা, টার্ম গুলো সহজ বাংলায় লিখা ; যা সত্যিই খুব কষ্টকর।
ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম -- সহজ কথা বলা যায় না সহজে।
আজ যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করব তা হচ্ছে আমাদের চিরাচরিত অভ্যেস গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খাওয়া নিয়ে। আমরা একটু পেটের সমস্যা হলেই ফার্মেসী থেকে গ্যাসের ঔষধ কিনে খাই।
ব্যাপারটা কি ঠিক হচ্ছে? সেটা আপনারাই উত্তর দিবেন। তার আগে কিছু জিনিস আপনাদের জানিয়ে দিচ্ছি ---


**প্রথমে একটা জিনিস আলোচনা করতে চাই, তা হলো আমাদের পাকস্থলী যে খাবার হজম হয় তা কিভাবে হয় আর তার জন্য কি কি লাগে। সোজা বাংলায় খাবার হজম বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো আমরা মুখের ভিতর খাবার নিয়ে তা দাঁত দিয়ে চিবানোর ফলে খাবার গুলো যে অর্ধচূর্ণ অবস্থায় থাকে তা পাকস্থলীর অবিরাম সংকোচন আর প্রসারণের ফলে যে ঘন মণ্ড এর মত পদার্থ তৈরি হয় সে প্রক্রিয়াকেই বুঝায়। সে প্রক্রিয়া শুধু যে পাকস্থলী তে হয় তা শুধু না। পাকস্থলীর পরে যে ক্ষুদ্রান্ত্র আছে তাতে ও এ প্রক্রিয়া চলমান।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষুদ্রান্ত্র শুধু খাবারকে হজম করে না, খাবার থেকে পুষ্টি ও শোষণ করে। ক্ষুদ্রান্ত্রে যে পুষ্টিগুণ শোষণ হয় তার জন্য উপযুক্ত হজম প্রক্রিয়া বা মণ্ড তৈরির প্রক্রিয়া কিন্তু পাকস্থলী থেকেই শুরু হয়। তাহলে দেখা যাক কিভাবে কি হয়।
পাকস্থলী থেকে খাবারকে হজম করার জন্য যে রসগুলো বের হয় তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে একটা এসিড, যার নাম হাইড্রোক্লোরিক এসিড। রসায়নবিদরা লিখে থাকেন HCl. এই এসিডের মাত্রা দিনের কোন কোন সময় এত বেশী থাকে যে তা যদি কাউকে ছুঁড়ে মারা হয় তাহলে নির্ঘাত ঝলসে যাবে
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে যে এসিড এত ঘনমাত্রায় মানুষ ঝলসে দিতে পারে সেটা পাকস্থলী কে গলিয়ে ফেলছে না কেন?
উত্তর হচ্ছে পাকস্থলী যাতে গলে না যায় সেজন্য পাকস্থলীর অভ্যন্তরে একটা আবরণ আছে, ফলে পাকস্থলীর মাংসপেশী আর এসিডের সংস্পর্শে আসতে পারে না। আর একটা প্রশ্ন আসতে পারে মনে, সেটা হলো ঈশ্বর কেন এত ঘনমাত্রার এসিড আমাদের ভিতর রাখলেন? দুর্ঘটনা যদি ঘটে যায়?
এসিড যদি কোন প্রকারে বাইরে এসে পাকস্থলী কে গলিয়ে ফেলে?
কেন ঈশ্বর এই ঘনমাত্রার এসিড দিলেন আমাদের পেটের ভিতর ---
আমাদের শরীর একটি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ মনে করা হলেও তা কিন্তু নয়। সে কিন্তু নয় দুয়ারী। এই নয় দুয়ারের একটি হচ্ছে মুখ। এই সমস্ত দুয়ার দিয়ে বাহিরের জগতের সমস্ত রোগ জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এই নয় দুয়ারের মধ্যে যে দুয়ারে সবচেয়ে বেশী জীবাণু বাস করে তা হচ্ছে মুখে। শুনলে অবাক হবেন যে মানুষের মলে যে জীবাণু পাওয়া যায় তার অধিকাংশেরই উৎস হচ্ছে মানুষের মুখ। আমরা প্রতিনিয়ত যে মুখের লালা গুলো গিলি এবং যে খাবার খাই তা ব্যাকটেরিয়া তে পূর্ণ। এ সমস্ত ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যে রয়েছে আমাশয়, কলেরা, ডায়রিয়া এবং টাইফয়েড এর জীবাণু।
এই জীবাণু যখন পাকস্থলী তে পৌঁছে তখন পাকস্থলী তে বিদ্যমান ঘনমাত্রার এসিড এগুলোকে মেরে ফেলে। কিন্তু যদি এই জীবাণু যদি পরিমানে বেশী হয় অথবা এসিড পরিমানে কম থাকে অথবা এসিডের ঘনত্ব/ মাত্রা কম থাকে তাহলে এসিড সব জীবানুকে মারতে পারে না। তাহলে বুঝতে পারছেন এই এসিড কেন আমাদের জন্য মঙ্গলকর?
আমাদের শরীরের আরেকটি দরজা হলো শ্বাস নালী। এই শ্বাসনালী খাদ্যনালীর পাশাপাশি থাকে। আবার নাক বন্ধ থাকলে মানুষ মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়.
সুতরাং দেখা যাচ্ছে ফুসফুস আসলে দুই দরজার জীবাণু দিয়ে হুমকিতে আছে। সবচেয়ে বেশি হুমকিতে থাকে মানুষ যখন ঘুমিয়ে পরে অথবা অজ্ঞান হয়ে যায়। আপনারা খেয়াল করেছেন, কোন কোন সময় মানুষের ঘুমের ভিতর কাশি হয়, অথবা অজ্ঞান অবস্থায় কাশি হয়। তার কারণ হচ্ছে আমাদের লালা অথবা পাকস্থলীর রস ফুসফুসে ঢুকে যাওয়া। এখন ভেবে দেখুন মুখ যদি পরিস্কার না থাকে অথবা পাকস্থলীর রস গুলো জীবানুতে ভর্তি থাকে তাহলে এই লালা আর হজমিরস ফুসফুসে গিয়ে নিউমোনিয়া করবে। এখন বুঝতে পারলেন কি, কেন আইসিউতে ভর্তি রোগীর নিউমোনিয়া হয়ে যায়, কেন অজ্ঞান রোগীদের নিউমোনিয়া হয়?
আমরা যে খাবার খাই তার পুষ্টি উপাদানের মধ্যে অন্যতম কিছু উপাদান হচ্ছে আয়রন, ভিটামিন B12, ক্যালসিয়াম। এই উপাদান গুলো ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষন হওয়ার জন্য হাইড্রোক্লোরিক এসিডের প্রয়োজন। এই এসিড না থাকলে শরীরে আয়রন শোষণ হতে পারবে না ফলে রক্তশুন্যতা দেখা দিবে। ভিটামিন B12 শোষণ হতে না পারলে রক্তশূন্যতার পাশাপাশি স্নায়বিক অবশ এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাবে। ক্যালসিয়াম শোষণ হতে না পারলে হাঁড়ের গঠন নরম হয় ফলে হাঁড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এবং হাঁড়ের এই সমস্যা মহিলাদের বেশী হয় বিশেষ করে যাদের ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে গেছে।
আরো অনেক উপকারিতা আছে এই পাকস্থলীর এসিডের। আর দীর্ঘ লিখতে চাচ্ছি না।
এবার আসি, আমাদের চিরাচরিত অভ্যেস গ্যাসের ঔষধ খাওয়ার প্রবণতা সম্মন্ধে। এই ঔষধ কিভাবে কাজ করে?
বাজারে প্রাপ্ত ওমিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল, র্যাবিপ্রাজল, ল্যান্সোপ্রাজল নামের ঔষধ যেগুলো সচরাচর ব্যবহৃত হয় সবগুলোই পাকস্থলীতে এসিড এর নি:সরণ কে কমিয়ে দেয় অথবা একেবারে বন্ধ করে দেয়। যার ফলে পাকস্থলীতে এসিডের পরিমান এবং ঘনত্ব কমে যায়। ফলশ্রুতিতে রোগীর এসিড সংক্রান্ত বুক জ্বালা এবং পেটের জ্বালা উপশম হয় কিছুটা। কিন্তু পেটের অথবা বুকের সব জ্বালা যন্ত্রণা তো আর এসিডের জন্য না। আর এসিডের জন্য হলেও তো আপনি দীর্ঘমেয়াদে এই ঔষধ খেতে পারেন না। কারণ যদি দীর্ঘমেয়াদে পাকস্থলীতে এসিড না থাকে তাহলে কি সমস্যা হতে পারে তা কি আর বলার দরকার আছে?
কিন্তু রোগী প্রশ্ন করে - স্যার, যদি একদিন ও গ্যাসের ঔষধ না খাই তাহলে এমন জ্বলুনি শুরু হয় বুকে আর পেটে, চলতে পারি না গ্যাসের ঔষধ ছাড়া। কি করব তাহলে? উত্তর হচ্ছে এই অবস্থার জন্য আপনি দায়ী, বিবেচনাহীন সুনামলোভী কিছু ডাক্তার দায়ী, ফার্মেসী মালিক দায়ী।
একটি উদাহরণ দেই।
আমার চেম্বারে আগত এই ধরণের রোগীগুলোকে আমি এই উদাহরণ টা বুঝিয়ে বলি। ধরুন, কর্ণফুলী নদী। নদীর উজানে আছে কাপ্তাই লেক। লেক থেকে পানি আসছে অবিরাম। বাঁধ দেয়া হল। কাপ্তাই বাঁধ। বাঁধের অপর প্রান্তে পানি বাড়ছে। এক সময় বাঁধ খুলে দেয়া হল। কি হবে? পানির জোয়ারে সব ভেসে যাবে না? ঠিক এইরকম ভাবে চিন্তা করুন প্রতিদিন পাকস্থলী থেকে যে এসিড বের হওয়ার কথা ছিল সেখানে আপনি ঔষধ দিয়ে বাঁধ দিয়েছেন। আর ঐ দিকে এসিড সব জমা হচ্ছে। যেদিন ঔষধ বন্ধ করলেন সাথে সাথে সব এসিড একসাথে পাকস্থলী তে এসে পড়ল জোয়ারের মত।
ফলে দ্বিগুণ মাত্রায় জ্বালা জ্বলুনি শুরু হল। ফলে আপনি ক্রমান্বয়ে গ্যাসের ঔষধ খেয়ে যাচ্ছেন আর আপনার ঝুঁকি বাড়ছে রক্তশূন্যতার, নিউমোনিয়ার, স্নায়বিক দুর্বলতার, স্মৃতিভ্রংশতার, হাঁড়ের ক্ষয় রোগের, আরো অনেক কিছুর। তাহলে কি
উপায়?!
ব্যাপারটা হচ্ছে, শরীর আপনার সিদ্ধান্তও আপনার ;
আপনি কি বেছে নিবেন।
ডা. হিরণ্ময় দত্ত
এমবিবিএস ( চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ),এমসিপিএস (মেডিসিন), এফসিপিএস (মেডিসিন).
পোস্ট ফেলোশিপ এডভান্সড ট্রেনিং ইন ডায়াগনস্টিক এন্ড থেরাপিউটিক গ্যাস্ট্রোএন্ডোসকপি।
মেডিসিন ও গ্যাস্ট্রোলিভার বিশেষজ্ঞ।
চেম্বার :
হলি হেলথ হাসপাতাল।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেইন গেইটের সামনের গলি।
সাক্ষাতের জন্য : ০১৮৬১২৯৪২৬৫
( সকাল ৯টা থেকে ১০ টায় সিরিয়াল দেয়া হয় )
( আপনার লেখা আপনার নাম সহ আমাদের সাইটে প্রকাশ করতে চাইলে ফেসবুক পেজ-এ বলুন )


Related Posts

গ্যাস্ট্রিকের ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
4/ 5
Oleh